• মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ পূর্বাহ্ন
  • [Welcome]
নোটিশ ::
আপনার নিজস্ব লেখা- ছোট গল্প,ধারাবাহিক গল্প, কবিতা,ভূতের গল্প আমাদের ম্যাগাজিন ওয়েবসাইটে পাবলিশ করতে এক্ষুনি যোগাযোগ করুন। ধন্যবাদ🍁

বাংলার সাত-মহলা জমিদার বাড়ি

রিপোর্টারের নাম / ৯১ বার
আপডেট সময়: বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪
default

বাংলার জমিদার বাড়ি কিম্বা রাজ বাড়ির কথা উঠলেই একটা বিশেষণ বার বার করে উঠে আসে, তা হল ‘সাত মহলা’ বাড়ি। ঠাকুমার ঝুলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপন্যাসে বাংলার লেখকরা এই সাত মহলা বাড়ির উল্লেখ করেছেন। এখন সমস্যা হল এই সাত শব্দটা আমাদের সাহিত্যে বারবার উঠে এসেছে, যেমন সাত সমুদ্র তেরো নদী, সাতকুলে কেউ নেই ইত্যাদি। তাই সাতমহলা বলতে কি সত্যিই সাতটা আলাদা আলাদা মহলযুক্ত বাড়ি নাকি সুবৃহৎ অট্টালিকাকে বোঝাতে এই সাত মহলা বাড়ির উল্লেখ করা হয়েছে?

এর উত্তর পাওয়া বেশ শক্ত। কারণ এখন অব্দি অনেক খুঁজেও আমি এই সাত মহলা বাড়ির আলাদা আলাদা সাতটা মহলের উল্লেখ পাইনি। বাস্তু শাস্ত্রে আলাদা করে সাত মহলের উল্লেখ নেই, বরং এই বিশেষণ একান্তই বাংলার। আর মহল শব্দের অর্থ গৃহ কিম্বা ভবনের অংশ দুই হতে পারে। ফলে সাত মহলা বলতে সাতটা আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট স্থাপত্য থাকবে নাকি পরস্পরসংযুক্ত সাতটা আলাদা আলাদা অংশ নিয়ে নির্মিত একটাই বৃহৎ অট্টালিকাকেও সাতমহলা বাড়ি বলা যাবে?

উত্তর জানা নেই!

সমস্যাটা হল পাল-সেন যুগে বাংলার রাজপ্রাসাদ ঠিক কেমন হত তার কোনো প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের কাছে নেই। বরং পাঠান/মুঘল আমলে যে প্রাসাদগুলো নির্মিত হয়েছিল তারই স্থাপত্যকীর্তি এবং প্ল্যানিং, আমাদের বাংলার জমিদারদের এবং স্থপতিদের প্রভাবিত করেছিল। সময়ের সাথে সাথে এবং প্রয়োজনের তাগিদে বাংলার নিজস্ব রীতি সেখানে যুক্ত হয়েছে। খড়ের দুর্গামণ্ডপ, জমিদারবাড়ির দুর্গাদালান হিসেবে জুড়ে গেছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর যে কয়েকশো নব্য জমিদারের উদ্ভব হল তারা ব্রিটিশদের অনুকরণ করে দুর্গাদালানের থাম বানিয়েছে গ্রিক ক্লাসিকাল অর্ডার মেনে। পূর্ব বঙ্গে আবার জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গনে মঠ স্থাপত্য মন্দির নির্মাণ করা শুরু হয়েছিল গির্জার সুউচ্চ চূড়ার অনুকরণ করে। এরকম অনেক মিশ্রণ ঘটেছে বাংলার জমিদারবাড়িগুলোর স্থাপত্যে।

এখন অব্দি আমার দক্ষিণ বঙ্গের জমিদারবাড়িগুলোতে ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছে, বড় জমিদারবাড়ি হলে মোটামুটি সাতের থেকে বেশিই আলাদা আলাদা মহল থাকত। নিচে তারই উল্লেখ করলাম –

১। সিংহদুয়ার এবং নহবতখানা (নহবতখানা হল মূলত বাদ্যঘর। গেটের উপরে হত এর অবস্থান। সকাল সন্ধ্যায় সানাই/তবলা ইত্যাদি বাজানো হত। বড় জমিদারবাড়ি হলে পরিখার পর গেট কমপ্লেক্স নির্মিত হত এবং গেটের উপর নিরাপত্তার খাতিরে সৈন্যদের ঘর এবং কামান বসানো হত। উদাহরণ – বাঁশবেড়িয়া রাজবাটী)

২। বাহির মহল (বাড়ির সামনের দিকের অংশ যেখানে প্রজাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হত, অনেকটা দিওয়ান-ই-আমের মত)

৩। নাটমহল (হিন্দু মন্দিরের সামনের অংশ যেখানে নৃত্য-গীত পরিবেশন করা হয়। পরবর্তীকালে বাহির মহলের সাথেই আলাদা করে নাটমন্দির নির্মিত হত আমোদ আল্লাদের জন্য।)

৪। দুর্গাদালান (এটা একান্তই বাংলার। খুব পুরনো কিছু দুর্গাদালান মূল জমিদারবাড়ির বাইরে নির্মিত হলেও বিগত ২০০ বছরে নির্মিত বাংলার জমিদারবাড়িতে মূলত বাড়ির সাথেই খোলা উঠোন এবং দুর্গাদালান নির্মিত হত।)

৫। অন্দর মহল (জমিদার পরিবারের থাকার জন্য নির্দিষ্ট অংশ)

৬। খাস মহল (জমিদার/রাজার ব্যক্তিগত ভবন)

৭। রানী মহল (রানী/জমিদার গিন্নীর ব্যক্তিগত ভবন)

৮। রং মহল (হারেম কিম্বা বাইজিদের থাকার নির্দিষ্ট মহল)

৯। কাছারি/কাচারি ঘর (খাজনা আদায়ের জন্য আলাদা জায়গা। জমিদারবাড়ির বাইরেও হতে পারে। অনেক জায়গায় আবার কাচারি ঘর মানে গেস্ট রুম।)

১০। ভৃত্য মহল (বড় জমিদারবাড়ির ক্ষেত্রে ভৃত্যদের থাকার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা করে একটা ভবন নির্মিত হত। যেমন- মহিষাদল রাজবাড়ি)

১১। বাগান – বাঁধানো পুকুর

মোটামুটি খুব বড় জমিদারবাড়ি হলে, সব মিলিয়ে এই দশ-এগারোটা আলাদা আলাদা অংশ থাকত। নিচের ড্রোন ফুটেজে, ইটাচুনা রাজবাড়ির বাহিরমহল এবং নাটমন্দির অংশদুটো পরপর বোঝা যাচ্ছে। উত্তরপূর্বে যে ছোট্ট উঠোনটা (courtyard) দেখা যাচ্ছে তাকে কেন্দ্র করেই অন্তরমহলের ঘরগুলো সাজানো। এবং বৃত্তাকার বাগানটার ডানদিকের অংশটাই মূলত কাছারি ঘর এবং ভৃত্য মহল হিসেবে ব্যবহার করা হত। আবার এই অংশেরই মধ্যে আলাদা করে নাচঘর বা নাচমহল ছিল (ছবিতে দেখতে পাবেন মাঝের অংশে ছাদটা সামান্য উঁচু হয়ে আছে। ওটাই নাচমহল।)

এখন দুই বাংলার সর্ব বৃহৎ জমিদারবাড়ি কোনটা আমার জানা নেই, পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে একাধিক সুবৃহৎ জমিদার বাড়ি রয়েছে যেমন কালিকাপুর, ইটাচুনা, মহিষাদল, হেতমপুর, বাওয়ালি,আন্দুল ইত্যাদি। এই বাড়িগুলোকে নিয়ে একধিক কাজ হয়েছে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্কিটেকচারাল প্ল্যানিং এবং সময়ের সাথে সাথে এই সুবৃহৎ অট্টালিকাগুলোর ফ্লোর প্ল্যানিং কিভাবে বদলেছে সেই নিয়ে আলোচনা সেভাবে হয়নি। ফলে এই নিয়ে গবেষণার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

আমার নিবন্ধে কোনো মহল বা অংশের উল্লেখ না থাকলে অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন। এই নিয়ে আলোচনা হোক এবং আমার বিশ্বাস আলোচনার মধ্যে দিয়ে আমরা প্রকৃত সত্যিটাকে খুঁজে বের করতে পারব। মধ্যযুগের বাংলার স্থপতিদের বংশপরম্পরায় অর্জিত জ্ঞান কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। ফলে শিল্প বিপ্লবের পর বাংলার মসলিন, মন্দির টেরাকোটার মত একাধিক শিল্পের সাথে সাথে বাংলার স্থপতিদের অর্জিত এই জ্ঞানও আজ হারিয়ে গেছে।

– অরুণাভ সান্যাল
_______________________________
ছবিটা হুগলীর ইটাচুনা রাজবাড়ির। এই বাড়ির এক বিশেষত্ব হল, এর ঠাকুরদালানখানা অর্ধ বৃত্তাকার হয়ে মূল স্থাপত্য থেকে খানিকটা এগিয়ে এসেছে। দুই বাংলায় সম্ভবত এমন বৃত্তাকার ঠাকুরদালান আর নেই। এখানে দুর্গা নয় বরং কৃষ্ণের পূজা-অর্চনা করা হয়। তার পিছনেও আছে এক আশ্চর্য ইতিহাস। মারাঠি কুন্দন পরিবার কিভাবে রাঢ় বাংলার গ্রামীন সমাজে মিশতে চেয়ে শিবের আরাধনা ছেড়ে, কৃষ্ণপ্রেমে মজে কুণ্ডু উপাধি পেল তা এখনো এই তল্লাটের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
https://slotbet.online/