বাংলার গ্রামীণ স্থাপত্য ।। পাণ্ডু রাজার ঢিপি থেকে ব্রিটিশ বাংলো।।
আচ্ছা, এই যে গ্রাম বাংলার কুঁড়েঘর কি খড়ের চারচালা- এ বানানো কি আর এমন কি ব্যাপার ? এর মধ্যে কি স্থাপত্যের বিশেষ কিছু কারিকুরি আছে ?
আছে। অবশ্যই আছে। আজকে এই নিয়েই বরং দু-চার লাইন লেখা যাক। গোলাকৃতি কিম্বা চৌকো মাটির বাড়ি কিন্ত বাংলায় আজ থেকে চার পাঁচ হাজার বছর আগেও নির্মাণ করা হত। বর্ধমানের পাণ্ডু রাজার ঢিপিতেই খনন করে এই ধরণের কিছু প্রাচীন বাড়ির অবশেষ পাওয়া গেছে। তখন অবশ্য খড়ের ছাদ বা চালা জিনিসটা এতটা ধনুকের মত এতটা বাঁকানো থাকত না!
পরবর্তীকালে সময়ের সাথে সাথে গ্রাম বাংলায় ধনুকের মত যে বাঁকানো খড়ের ছাদ বা চালা দেখা যায় – তা কিন্তু বাংলার একান্তই নিজস্ব স্থাপত্যরীতি। চালার দুধারের বাঁকানো অংশগুলোকে বলে ছাঁচা । বাংলায় বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাতের কথা মাথায় রেখেই এরকম আকার দেওয়া শুরু হয়েছিল বাংলার জলবায়ুর কথা মাথায় রেখে।
খেয়াল করবেন মাটি,বাঁশ,খড়,ধানের তুষ-ইত্যাদি দিয়ে বানানো দেওয়ালগুলো হয় অস্বাভাবিক রকম চওড়া। এর ফলে কি হয় শীতকালে একবার ঘর গরম করা হলে সেই উত্তাপ যেমন বহুক্ষণ ধরে জমে থাকে , ঠিক তেমনই গরম কালে প্রখর রোদের তাপ দেওয়াল ভেদ করে সহজে ঢুকতে পারেনা । গরমকালে মাটির মেঝেতে জল ঢেলে চাটাই পেতে শুয়ে থাকতে যে কি আরাম !
এবার আসি জানলাগুলোতে । রাস্তার দিকের জানলাগুলো হয় আকারে বেশ ছোট আর আনেক উঁচুতে । আসলে জানলা উঁচুতে থাকলে – সাপ চট করে দেওয়াল বেয়ে যেমন ঘরে ঢুকতে পারেনা তেমনই রাস্তার মানুষ চট করে অন্তরমহলের খবর পায়না । এছাড়াও লক্ষ্য করবেন বাইরের উঁচু জানলা এমন ভাবেই বসানো থাকে যে সকাল ৯-১০টার পর সূর্যের তাপ বাড়লে , সেই উত্তপ্ত রোদ আর ঘরের ভেতর ঢুকতে পারেনা । কারন চালার বাঁকানো ছাঁচা আংশটা এমন ভাবেই বেরিয়ে থাকে যে বেলা বাড়লে জানলাটা ,ছাঁচার ছায়ার নীচে চলে আসে।
অন্তরমুখী বা দাওয়ার দিকের জানলাগুলো আকারে তুলনামূলক বড় হয় । মাটির বাড়ির এই দাওয়া বা বারান্দা অংশটা আদতে Transition Space কারন দাওয়াটা Private Space (শোবার ঘর) ও Public Space(দালান) এর মধ্যে যোগসূত্র রচনা করছে । এছাড়াও বাইরের পায়ে চলা মেঠো রাস্তার থেকে বাড়ির ভেতরের দালান সবসময় উঁচুতে থাকে।
কখনও সাঁওতাল গ্রামে গেলে খেয়াল করে দেখবেন মাটির বাড়ির গায়ে অনেক সময় লো রিলিফ মিউরাল বা দেওয়ালচিত্র আঁকা থাকে । শরৎ কালে আদিবাসীদের বাদনা পরব বা সোহরাইয়ের সময় বাড়ির মেয়েরা মাটিতে আল্পনা আঁকার সাথে সাথে অনেক সময় আঙুল দিয়ে বা বাঁশের ছোট কঞ্চি দিয়ে দেওয়ালে বিভিন্ন মিউরাল বা দেওয়াল চিত্র বানায়। মিউরালের বিষয়বস্তু ভীষণই সহজ সরল আর কাল্পনিক হলেও এই সব ছবিগুলোর মধ্যেই হাজার বছরের গ্রামীণ ভারতবর্ষ লুকিয়ে থাকে।
বানানোর সময় – গোবর , চিটে গুড়, আলকাতরা, খড়িমাটি, বেলেমাটি, ধানেরশীষ, ভেষজরঙ -ইত্যাদির ব্যবহার করা হয় । এই দেওয়াল চিত্র যেমন একদিকে সৌন্দর্যসাধন করে , ঠিক তেমনই মাটির দেওয়ালকে রক্ষা করে বর্ষার সময় । অমসৃণ দেওয়ালে বর্ষার জলধারা বহু ধারায় বিভক্ত হয়ে সহজে মাটি ধুয়ে নিয়ে যেতে পারেনা।
আসলে বাংলার এই গ্রামীণ স্থাপত্য তো কোন একজন স্থপতির পরিশ্রমের ফসল নয় , বরং হাজার বছরের গ্রামীণ লোকসভ্যতা ও তার বিবর্তনের ফসল। এখানে তার সামান্য কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম। এখানে তার সামান্য কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম । বাংলার গ্রামের ”Cluster Planning” ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরে একদিন আলোচনা করা যাবে।
তবে লেখাটা শেষ করার আগে একটা মজার তথ্য দিয়ে শেষ করি। এই যে ব্রিটিশ বাংলো প্যাটার্নের (Bungalow) বাড়ি তৈরির চল শুরু হয় ইউরোপে তার মূল অনুপ্রেরণা কিন্ত আমাদের গ্রাম বাংলার এই চালা স্থাপত্য থেকেই নেওয়া। বাংলা ঘর বা বেঙ্গল লো রুফ থেকেই বিভিন্ন ভাষা ঘুরে ইংলিশে বাংলো শব্দটা এসেছে। ব্রিটিশরা ইউরোপে এই বাংলো বাড়ি বানানো শুরু করার পর, এই স্থাপত্য রীতি আমেরিকাতেও ভীষণ জনপ্রিয় হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। এভাবেই তো এক মহাদেশের স্থাপত্য আরেক মহাদেশে ছড়িয়ে যায়, দুয়ের মিশ্রণে গড়ে ওঠে কোন নতুন স্থাপত্যরীতি।
_______________________________________________________________
1860 সালে তোলা অস্কার জিন ব্যাপ্টিস্ট ম্যালিট্টের এই ছবিতে আমরা দেখতে পাই কলকাতার কাছের একটি পাঠশালার দৃশ্য। সাধারণ দোচালা বাড়ি। কিন্তু আজকাল আর সামনের ওই বারান্দার ওপরের বাঁকানো অংশটা দেখতে পাওয়া যায়না বললেই চলে। আজকের দিনে এই রকম নিচু চালা খুবই বিরল। এছাড়া আপনারা, জয়রামবাটী কামারপুকুর গেলেও কিছু খুব পুরোনো মাটির বাড়ি দেখতে পাবেন যা এখনো সংরক্ষণ করা আছে (মায়ের পুরাতন বাড়ি)।
https://slotbet.online/